Logo

স্বাধীন গৌড়বাংলা জনপদের আত্মপ্রকাশ :-

স্বাধীন গৌড়বাংলা জনপদের আত্মপ্রকাশ :-

স্বাধীন গৌড়বাংলা জনপদের আত্মপ্রকাশ :-
***************************************
ভূমিকা :-
********
গৌড়েশ্বর শশাঙ্ক ছিলেন একজন বিচক্ষণ সুশাসক এবং প্রচীন বংলা জনপদের প্রথম স্বাধীন পরাক্রান্ত নরপতি। তিনি বাংলার বিভিন্ন ক্ষুদ্র ক্ষুদ্র রাজ্যকে একত্রিত করে গৌড় নামক জনপদের প্রতিষ্ঠা করেন। খ্রিস্টীয় ৭ম শতাব্দীতে তাঁর রাজত্বকালে গৌড়রাজ্য উন্নতি ও সমৃদ্ধির চূড়ায় পৌঁছেছিল তার প্রমান মেলে শশাঙ্কের উন্নতমানের রাজকীয় স্বর্ণমুদ্রা আর হিউ-এন-সাঙের ভারত ভ্রমন বৃত্তান্ত ‘সি-য়ু-কি’ তে। ঐতিহাসিক মহলে কারো কারো মতে তিনি ৬০৩ হতে ৬৩৭ খ্রিস্টাব্দের মধ্যে রাজত্ব করেন। তাঁর রাজধানীর নাম ছিল রাঙামাটি কর্ণসুবর্ণ বা কানসোনা। রাজনৈতিক বিচক্ষণতার কারনে বাংলার ইতিহাসে তিনি বিশিষ্ট স্থান অধিকার করে আছেন।

শশাঙ্কের রাজত্বকাল সম্পর্কিত বিভিন্ন উপাদান :-
*******************************************
মৌর্য্য সম্রাট অশোকের ন্যায় শশাঙ্কের কোন শিলালিপি না থাকায় তাঁর সম্বন্ধে বিশেষ কিছু জানা যায় না। তবে তাঁর ব্যপারে জানার জন্য আমাদের যেসব উপাদানের উপর নির্ভর করতে হয় তা নিম্নলিখিত :
১. স্থানেশ্বররাজ হর্ষবর্ধনের সভাকবি বাণভট্ট প্রনীত হর্ষচরিত গ্রন্থ,
২. চৌনিক পরিব্রাজক হিউ-এন-সাঙের ভারত ভ্রমন বৃত্তান্ত ‘সি-য়ু-কি’ গ্রন্থ,
৩. হর্ষবর্ধনের ‘বাঁশখেরা’ ও ‘মধুবন’ তাম্রশাসন,
৪. গঞ্জামের সামন্তরাজ দ্বিতীয় মাধববর্মার তাম্রশাসন(৬১৯ খ্রীস্টাব্দে উৎকীর্ন),
৫. কামরূপরাজ ভাষ্করবর্মার নিধনপুর তাম্রশাসন,
৬. বৌদ্ধ গ্রন্থ ‘বোধিসত্ত্বপিটকাবতংসক’ বা ‘মঞ্জুশ্রীমূলকল্প’,
৭. শশাঙ্ক কর্তৃক উৎকীর্ন কয়েকটি স্বর্ন ও রৌপ্যমুদ্রা(যা ১৮৫২ সালে যশোরের একটি গ্রামে খননকার্যে পাওয়া গেছিল),
৮. রোহতাসগড়ে আবিষ্কৃত শিলমোহরের ছাঁচ,
এবং
৯. ১৯৩৭ খ্রীস্টাব্দে মেদিনীপুরের তৎকালীন ম্যাজিস্ট্রেট বিনয়রঞ্জন সেন কর্তৃক এক মুসলমান গৃহস্থের কাছ থেকে সংগৃহীত দুটি তাম্রশাসন(মেদিনীপুর তাম্রশাসন ও খড়গপুরের এগড়া তাম্রশাসন)।

প্রাথমিক জীবন :-
****************
শশাঙ্কের প্রাথমিক জীবন সম্পর্কে অতি অল্প তথ্য জানা যায়। ধারণা করা হয় যে, তিনি রোহতাসগড়ের মহাসামন্ত হিসেবে কর্ণসুবর্ণের গৌড় রাজার অধীনে কিছুদিন রাজ্য শাসন করেন। কর্ণসুবর্ণের গৌড় রাজা ছিলেন সম্ভবত কনৌজদেশীয় মৌখরী বংশের প্রতিনিধি। কর্ণসুবর্ণের অপর একজন রাজা জয়নাগ শশাঙ্কের সমসাময়িক বলে প্রতীয়মান হয়। বস্তুত কর্ণসুবর্ণ ছিল শশাঙ্কের রাজধানী এবং এই বিখ্যাত নগরী অবস্থিত ছিল পশ্চিমবঙ্গের মুর্শিদাবাদ জেলায় রাজবাড়িডাঙ্গা বা রাক্ষুসীডাঙার (রক্তমৃত্তিকা মহাবিহারের প্রত্নস্থল অথবা আধুনিক রাঙ্গামাটি) সন্নিকটে যদুপুর বাসডিপোর কাছে।
কনৌজদেশীয় মৌখরীরাজ ঈশানবর্মার ‘হড়াহা’ লিপি থেকে জানা যায় যে গুপ্তসম্রাট বিষ্ণুগুপ্ত তার মামা ছিলেন। তিনি ৫৫০ খ্রীস্টাব্দে সিংহাসন আরোহন করেন এবং ৫৫১ খ্রীস্টাব্দে বিষ্ণুগুপ্তের মৃত্যুর পর গুপ্তদের অধীনতা ছিন্ন করে স্বাধীন কনৌজের প্রতিষ্ঠা করেন। এছাড়াও জয়নাগের রাজত্বকালে তিনি গৌড় আক্রমন করে গৌড় সেনাবাহিনীকে সমুদ্রাশ্রয় করেছিলেন।
লিপিমালা এবং সাহিত্যিক সূত্রে শশাঙ্ক গৌড়ের শাসক হিসেবে বর্ণিত হয়েছেন। সংকীর্ণ অর্থে পদ্মা ও ভাগীরথী নদীর মধ্যবর্তী অঞ্চলই গৌড়। কিন্তু সময়ের বিবর্তনে এক বিস্তৃত এলাকা এর অন্তর্ভুক্ত হয়। ‘শক্তিসঙ্গম তন্ত্র’গ্রন্থের ৭ম পটল ‘সটপঞ্চষদ্দেশবিভাগ’ এ বলা হয়েছে যে, গৌড়ের সীমানা বঙ্গদেশ হতে ভুবনেশ বা উড়িষ্যার ভুবনেশ্বর পর্যন্ত বিস্তৃত হয়েছিল।

শশাঙ্কের প্রকৃত পরিচয় :-
**********************
শশাঙ্ক প্রকৃতপক্ষে কে বা তা স্বরূপ কি? এব্যপারে নানা মুনির নানা মত।
১. ফিটজ এডওয়াড হলের মতে শশাঙ্ক গুপ্তবংশীয় রাজা ছিলেন।
২. শশাঙ্কের মুদ্রায় ‘নরেন্দ্রবনিত’ লেখা আছে আর অন্যপিঠে ‘সমাচারদেব’ নামটি পাঠ করে নলিনীকান্ত ভট্টশালী শশাঙ্ককে বঙ্গদেশীয় সমাচারদেবের বংশধর বলেছেন।
৩. শশাঙ্কের অন্যনাম নরন্দ্রগুপ্ত হওয়াই মুর্শিদাবাদ জেলার বহরমপুর শহরের প্রখ্যাত ঐতিহাসিক রাখালদাস বন্দোপাধ্যায় প্রমান করতে চেয়েছেন শশাঙ্ক সম্ভবত মগধের উত্তরকালীন গুপ্তবংশীয় শাসক মহাসেনগুপ্তের পুত্র অথবা ভ্রাতুস্পুত্র ছিলেন।
৪. আর. কে. মুখার্জী শশাঙ্কের মুদ্রায় নরেন্দ্রাদিত্য লেখটি দেখেন এবং মালবরাজ দেবগুপ্তের সাথে শশাঙ্কের ঘনিষ্ঠতা প্রসঙ্গে বলেন “উভয়েই গুপ্ত বংশীয় এবং রক্তসম্পর্কিত। আদি গুপ্ত সম্রাটদের ন্যায় শশাঙ্ক নরেন্দ্রাদিত্য উপাধি গ্রহন করেছিলেন।”
৫. ভুলার সাহেব জানান যে হর্ষচরিতের কোন এক পুথিতে গৌড়রাজের নাম নরেন্দ্রগুপ্ত বলা হয়েছে।
৬. রাধাগোবিন্দ বসাকের মতে শশাঙ্ক রাজ জয়নাগের বংশধর ছিলেন।
৭. মঞ্জুশ্রীমূলকল্পে শশাঙ্ককে ব্রাহ্মণ বংশজাত বলা হয়েছে।
৮. হিউ-এন-সাঙের বিবরনে শশাঙ্ককে শৈব বলা হয়েছে।
৯. দীনেশচন্দ্র সরকারের মতে শশাঙ্ক প্রথমজীবনে গৌড়রাজ মহাসেনগুপ্তের সামন্তরূপে রোহতাসগড়ের শাসক ছিলেন।
১০. অনেকের মতে তিনিই গৌড়ের প্রথম স্বাধীন বাঙালী শাসক ছিলেন।
১১. হর্ষচরিতের টীকাকার শঙ্কর তৎকালীন গৌড়েশ্বরকে শশাঙ্ক নামেই অভিহিত করেছেন।
১২. কঙ্গোদের শৈলোদ্ভব বংশীয় মহাসামন্ত শ্রীমাধবরাজের ৬১৯ খ্রীস্টাব্দে উৎকীর্ন লিপিতে শশাঙ্ককে উক্ত সামন্ত রাজার অধিরাজ বলে উল্লেখ করা আছে।

শশাঙ্কের উত্থান :-
****************
শশাঙ্ক প্রথম জীবনে মহাসেনগুপ্তের আমলে রোহতাসগড়ের সামন্ত শাসক ছিলেন। পরে মহাসামন্ত পদে উন্নীত হন। অযোগ্য মহাসেনগুপ্তের অধীনতা ছিন্ন করে ৬০৩ খ্রীস্টাব্দে স্বাধীন গৌড় রাজ্যের স্থাপনা করেন।

জোটশক্তি গঠন :-
****************
মহাসেনগুপ্তের ভগিনী মহাসেনগুপ্তাদেবী স্থানেশ্বরের পষ্যুভূতি বংশীয়রাজা প্রভাকরবর্ধনের মাতা ছিলেন। মহাসেনগুপ্তের মৃত্যুর পরে দেবগুপ্ত মালবের সিংহাসন দখল করলে মহাসেনগুপ্তের দুই পুত্র কুমারগুপ্ত ও মাধবগুপ্ত স্বরাজ্য থেকে বিতারিত হয়ে স্থানেশ্বরে প্রভাকরবর্ধনের কাছে আশ্রয় নেয়। বিষ্ণুগুপ্ত ঈশানবর্মার মামা হওয়াই গুপ্ত ও মৌখরীদের শক্তি জোট পূর্ব হতেই ছিল। প্রভাকরবর্ধন নিজ কন্যা রাজ্যশ্রীর সাথে মৌখরীরাজ গ্রহবর্মার বিবাহ দানের মাধ্যমে কনৌজদেশীয় মৌখরীদের সাথে শক্তিজোট গঠন করেন। আর মহাসেনগুপ্তের সাথে পূর্ব হতেই থানেশ্বরের শক্তিজোট ছিল। দেবগুপ্ত মালবের সিংহাসন দখল করায় স্থানেশ্বরের শত্রুতে পরিনত হয়। এমত অবস্থায় স্থানেশ্বর ও কনৌজের বৈবাহিক সম্পর্কের মাধ্যমে শক্তি জোট গঠন দেবগুপ্তকে শঙ্কিত করে। এদিকে মৌখরীরাজ সর্বাবর্মা ও অবন্তীবর্মার রাজত্বকালে গৌড়ের রোহতাসগড়ে মৌখরীদের শাসন কায়েম ছিল। শশাঙ্ক স্বপরাক্রমে গৌড় থেকে মৌখরীদের বিতরন করেন এবং গৌড় মৌখরীদের শত্রুরাজ্যে পরিনত হয়। মহাসেনগুপ্তের অধীনতা ছিন্ন করার কারনে গৌড় স্থানেশ্বরের শত্রুরাজ্যে পরিনত হয়। কারন সম্পর্কের দিক থেকে মহাসেনগুপ্ত প্রভাকরবর্ধনের মামা ছিলেন। চরম প্রতিকূল পরিস্থিতিতে মালবরাজ দেবগুপ্ত শশাঙ্কের কাছে শক্তিজোট গঠনের প্রস্তাব পাঠান। শশাঙ্কের সম্মতিতে গৌড়-মালব শক্তিজোট গঠিত হয় এবং সাম্রাজ্যবাদের ইতিহাসে গৌড় নিজস্ব স্বতন্ত্রতা প্রতিষ্ঠা করে।

<

গৌড়-কনৌজ প্রতিদ্বন্দ্বিতা :-
*************************
শশাঙ্ক সিংহাসনে বসেই নিজেকে গৌড়াধিপ নামে পরিচিত করেন। ভারতের বিভিন্ন অংশে রাজনৈতিক প্রভাব সম্প্রসারণের সূত্র ধরেই গৌড়-মালব মিত্রজোটের সাথে স্থানেশ্বর-কনৌজ মিত্রজোটের সংঘর্স বাঁধে। মগধকে মৌখরী নিয়ন্ত্রনমুক্ত করার উদ্দেশ্যে শশাঙ্ক তাঁর মিত্র মালবের রাজা দেবগুপ্তকে সঙ্গে নিয়ে পুষ্যভূতি রাজ প্রভাকরবর্ধনের জামাতা মৌখরী রাজ গ্রহবর্মার বিরুদ্ধে যুদ্ধে লিপ্ত হন। প্রভাকরবর্ধনের মৃত্যুর পর ৬০৫ খ্রীস্টাব্দে গৌড়েশ্বর শশাঙ্কের সমর্থনপুষ্ট মালবরাজ দেবগুপ্তের হাতে কনৌজদেশীয় মৌখরীরাজ গ্রহবর্মা পরাজিত ও নিহত হন। কনৌজের রানী রাজ্যশ্রীকে কারাগারে বন্দী করা হয়। এরপর প্রভাকরবর্ধনের জ্যেষ্ঠ পুত্র বৌদ্ধ ধর্মাবলম্বী থানেশ্বর রাজ রাজ্যবর্ধন দেবগুপ্তের বিরুদ্ধে অগ্রসর হন এবং দেবগুপ্তকে পরাজিত ও নিহত করেন। কিন্তু শশাঙ্কের সঙ্গে সংঘর্ষে রাজ্যবর্ধন নিহত হন। শশাঙ্কের হাতে রাজ্যবর্ধনের মৃত্যু নিয়ে মতভেদ আছে।
১. বানভট্টের হর্ষচরিতানুযায়ী কোন এক সত্যরক্ষার্থে রাজ্যবর্ধন নিরস্ত্র অবস্থায় শত্রুগৃহে যান এবং সেখানেই তাকে হত্যা করা হয়।
২. হর্ষচরিতের টীকাকার শঙ্করের মতে শশাঙ্ক নিজ কন্যার সাথে রাজ্যবর্ধনের বিবাহ দিয়ে স্থানেশ্বরের সাথে সন্ধি স্থাপনে আগ্রহী ছিলেন। রাজ্যবর্ধন প্রস্তাবে রাজী হয়ে গৌড় যাত্রা করেন এবং শত্রুগৃহে তাকে ছল-কপটতার সাহায্যে হত্যা করা হয়।
৩. আরেকটা সূত্র হতে জানা যায়, দেবগুপ্তকে পরাজিত করার পর রাজ্যবর্ধন প্রতিশোধের উদ্দেশ্যে গৌড় যাত্রা করেন। শশাঙ্ক রাজ্যবর্ধনকে ব্যক্তিগত মল্লযুদ্ধে আহ্বান জানান। সেই মল্লযুদ্ধে রাজ্যবর্ধন শশাঙ্কের হাতে পরাজিত ও নিহত হন।

হর্ষবর্ধনের সঙ্গে দ্বন্দ্ব :-
********************
৬০৬ খ্রীস্টাব্দে শশাঙ্কের হাতে রাজ্যবর্ধন নিহত হলে স্থানেশ্বর ও কনৌজের সিংহাসন যুগপৎভাবে শূন্য হয়। প্রবল অনিচ্ছা সত্বেও বাণভট্ট ও অন্যান্য মন্ত্রীপরিষদের অনুরোধে হর্ষবর্ধন কিশোর বয়সে যুবরাজ শিলাদিত্য উপাধি নিয়ে রাজ্য পরিচালনা শুরু করেন। দেবগুপ্তের মৃত্যুর পর মহাসেনগুপ্তের পুত্র মাধবগুপ্ত মালবের সিংহাসন আরোহন করেন এবং শশাঙ্কের বিরুদ্ধে হর্ষবর্ধনকে সমর্থন করেন। ভ্রাতা রাজ্যবর্ধন, ভগ্নীপতি গ্রহবর্মার হত্যাকারী এবং ভগিনী রাজ্যশ্রীকে কারাগারে নিক্ষেপকারী গৌড়াধিপতি শশাঙ্ককে জব্দ করার জন্য হর্ষবর্ধন স্থানেশ্বর ও কনৌজকে একত্রিত করেন শুধু তাই নয় শশাঙ্কের পূর্ব সীমান্তের প্রতিবেশী কামরূপরাজ ভাষ্করবর্মা এবং মালবরাজ মাধবগুপ্তের সাথে হাত মেলান। তিনজনের মিলিত বাহিনী শশাঙ্ককে চরম শাস্তিদানের উদ্দেশ্যে গৌড় অভিমুখে যাত্রা করে। তার আগে এক বিশ্বস্ত অনুচরের মুখে ভগিনী রাজ্যশ্রীর খবর পেয়ে হর্ষবর্ধন কিছু অনুচর নিয়ে বিন্ধ্যারন্যের দিকে যাত্রা করেন। বাণভট্টের হর্ষচরিত থেকে জানা যায়, হর্ষবর্ধন ভাণ্ডির ওপর সেনাবাহিনীর দায়িত্ব অর্পণ করে নিজে বিন্ধ্য পর্বতের জঙ্গলে তাঁর বোন রাজ্যশ্রীকে উদ্ধারকার্যে ব্যস্ত ছিলেন। বোনকে উদ্ধারের পর তিনি নিজ সৈন্যদলের সঙ্গে মিলিত হন। এরপর হর্ষবর্ধন বোন রাজ্যশ্রীর অনুমতি নিয়ে কান্যকুব্জ বা কণৌজের সিংহাসনে আরোহন করেন। স্থানেশ্বর, কনৌজ, মালব এবং কামরূপ রাজ্যের মিলিত বাহিনীর বিরুদ্ধে শশাঙ্কের গৌড় বাহিনীর যুদ্ধের ব্যপারে বাণভট্টের হর্ষচরিত পুরোপুরিভাবে নিরব যেমন টি চালুক্যরাজ দ্বিতীয় পুলকেশির বিরুদ্ধে হর্ষবর্ধনের যুদ্ধযাত্রার ব্যপারে বানভট্টের হর্ষচরিত নিরব। গুজরাটে প্রভুত্ব বিস্তারের সূত্র ধরেই স্থানেশ্বর ও বাতাপি রাজ্যের মধ্যে দ্বন্দের সূত্রপাত হয়। হর্ষবর্ধনের বাহিনী এবং দ্বিতীয় পুলকেশির বাহিনী সংঘর্সে লিপ্ত হয়। যুদ্ধক্ষেত্রে হর্ষবর্ধনের চুড়ান্ত পরাজয় ঘটে এবং তিনি দাক্ষিনাত্য জয়ের স্বপ্ন চিরতরের জন্য ত্যাগ করেন। চালুক্যরাজ দ্বিতীয় পুলকেশি হর্ষবর্ধনকে ‘সকলোত্তরপথনাথ’ এবং নিজেকে ‘দক্ষিনাপথনাথ’ আভিধায় ভূষিত করেন। বাতাপি ও স্থানেশ্বর রাজ্যের যুদ্ধের কাহিনী চালুক্যরাজ দ্বিতীয় পুলকেশীর সভাকবি রবিকীর্তি রচিত আইহোলপ্রসস্তি শিলালিপি থেকে জানা যায়। চরম ঘৃনা, দ্বেষ, ক্ষোভ নিয়েও যে হর্ষবর্ধন ও তার সঙ্গীসাথীরা যে গৌড়াধিপতি শশাঙ্কের কোন অনিষ্ট সাধনে সক্ষম হননি তার প্রমান শশাঙ্কের স্বর্ণমুদ্রা ও মেদিনীপুর তাম্রশাসন। এখনে দেখা যাচ্ছে যে হর্ষবর্ধন গৌড়েশ্বরের নামে ক্ষোভে ফেটে পড়তেন সেই হর্ষবর্ধনের রাজ্যাভিষেকের ১০-১৫ বছর পরেও শশাঙ্ক স্বমহিমায় সার্বভৌম গৌড় সাম্রাজ্যের মধ্যগগনে শৌর্য-বীর্যের সঙ্গেই রাজ্য শাসন অব্যাহত রাখেন। শশাঙ্ক উত্তর উড়িষ্যা এবং বাংলা ব-দ্বীপাঞ্চলের দক্ষিণাংশও তাঁর সাম্রাজ্যভুক্ত করেন। খুব সম্ভবত ৬৩৬-৬৩৭ খ্রীস্টাব্দে শশাঙ্কের মৃত্যু হয়। তাঁর মৃত্যুর পর পুত্র মানবদেব গৌড়ের সিংহাসন আরোহন করেন। হর্ষবর্ধন তার রাজত্বকালের শেষদিকে ৬৪২-৬৪৩ খ্রীস্টাব্দে গৌড়েশ্বর মানবদেবের আমলে দক্ষিণ-পূর্ব বিহার ও উড়িষ্যায় প্রাধান্য প্রতিষ্ঠা করেন এবং একই সময়ে ভাস্করবর্মন রাজধানী নগর কর্ণসুবর্ণ অধিকার করেন বলেও মনে হয়। তখন গৌড়ে হর্ষবর্ধন ও ভাষ্করবর্মা কয়েকদিন ধরে উৎসবে মেতে ছিলেন একথার উল্লেখ আছে ভাষ্করবর্মার নিধনপুর তাম্রশাসনে। এ সকল ঘটনা শশাঙ্কের মৃত্যুর পরই ঘটেছিল, কেননা ততদিনে গৌড়ের শক্তির পতন হয়েছে এবং শশাঙ্ক সম্পর্কেও তেমন কিছু শোনা যায়নি। কিন্তু বৌদ্ধ গ্রন্থ আর্যমঞ্জুশ্রীমূলকল্পে পুণ্ড্রবর্ধনের যুদ্ধে হর্ষের হাতে শশাঙ্কের পরাজয়ের কাহিনী এবং শশাঙ্কের ১৭ বছরের রাজত্বকাল সম্পর্কে যা বলা হয়েছে, তা সমসাময়িক অপর কোন উৎস দ্বারা সমর্থিত নয়। বরং অতি সম্প্রতি দক্ষিণ মেদিনীপুর হতে আবিষ্কৃত শশাঙ্কের লিপিতে দণ্ডভুক্তি জনপদের অস্তিত্বের উল্লেখ রয়েছে, যা মেদিনীপুর ও উড়িষ্যার অংশবিশেষ নিয়ে গঠিত ছিল।
হর্ষবর্ধন প্রথমদিকে শৈব ধর্মের অনুগামী ছিলেন, কিন্তু ধীরে ধীরে তিনি বৌদ্ধ ধর্মের একজন মহান পৃষ্ঠপোষকে পরিণত হন। তিনি মহাযান মতবাদ প্রচারের জন্য কণৌজে এক বিশাল সভার আহ্বান করেন। হর্ষবর্ধন ব্রাহ্মণদের বিদ্রোহ অত্যন্ত নিষ্ঠুরভাবে দমন করেছিলেন বলে কথিত আছে। কণৌজের পর তিনি প্রয়াগেও অনুরূপ বিশাল ধর্ম সভার আয়োজন করেন। কণৌজ ও প্রয়াগের বৌদ্ধ সমাবেশে হিউয়েন-সাং এবং সীমান্তবর্তী সকল রাজ্যের রাজা, মন্ত্রী, অভিজাত প্রমুখ অংশ নেন। বৌদ্ধ ধর্মের প্রতি বিরূপ মনোভাবাপন্ন শশাঙ্ককে শায়েস্তা করার জন্যই বোধিস্বত্বের নির্দেশে হর্ষের জন্ম হয়েছে বলে হিউ-এন-সাং বিশেষভাবে উল্লেখ করেন। তিনি শশাঙ্কের কয়েকটি বৌদ্ধ ধর্মবিরোধী কাজকর্মের উদাহরণও তুলে ধরেন।
কিন্তু নালন্দায় অবস্থিত বৌদ্ধ বিহারের উল্লেখযোগ্য অগ্রগতি, যেখানে হিউ-এন-সাং নিজেও বেশ কিছুদিন লেখাপড়া করেছিলেন, এবং শশাঙ্কের রাজধানী শহর কর্ণসুবর্ণের উপকণ্ঠে রক্তমৃত্তিকা মহাবিহারসহ বেশ কিছু সংখ্যক(১০ টি) বৌদ্ধ মঠের অস্তিত্ব থেকে প্রমানিত হয় যে শশাঙ্কের বৌদ্ধবিদ্বেষের ব্যপারে হিউয়েন-সাং প্রদত্ত তথ্যটি পুরোপুরিভাবে মিথ্যা। অন্যদিকে হর্ষবর্ধনের পৃষ্ঠপোষকতা লাভকারী চৈনিক তীর্থযাত্রী হিউ-এন-সাং শশাঙ্ক সম্পর্কে বলতে গিয়ে হর্ষের প্রতি গভীর পক্ষপাতিত্ব করেছেন তাতে কোন সন্দেহ নেই। গৌড়াধিপের (শশাঙ্কের নাম উল্লিখিত হয় নি) বিরুদ্ধে হর্ষবর্ধনের সভাকবি বাণভট্ট কটূক্তিপূর্ণ ভাষা যেমন ‘গৌড়ভুজঙ্গ’ বা ‘গৌড়াধম’ ইত্যাদি ব্যবহার করে শশাঙ্কের প্রতি ঘৃণা প্রকাশ করেন। এটি সত্য যে, শশাঙ্ক ব্রাহ্মণ্য ধর্মের একজন শক্তিশালী পৃষ্ঠপোষক এবং পরম শৈব ধর্মানুরাগী ছিলেন। বৌদ্ধবিদ্বেষ নয় হর্ষবর্ধনের সাথে শত্রুতার কারনেই হয়ত ধনী বণিক শ্রেণী এবং হর্ষের পৃষ্ঠপোষকতা লাভকারী ব্যক্তিবর্গ শশাঙ্কের বিরুদ্ধাচরন করেছেন। অনেকে লেখনীর জোরে শশাঙ্ককে বৌদ্ধবিদ্বেষী, গৌড়াধম বলে তার চরিত্রকে মিথ্যাচারের দ্বারা কালিমালিপ্ত করেছেন।
অপরপক্ষে বৌদ্ধ ধর্মের প্রতি হর্ষবর্ধনের অন্ধ অনুরাগ এবং ব্রাহ্মণ্যবাদের প্রতি বিদ্বিষ্ট মনোভাব (এ প্রসঙ্গে কণৌজ সমাবেশের সময় বিপুল সংখ্যক ব্রাহ্মণকে নৃশংসভাবে দমন করার ঘটনা উল্লেখ করা যেতে পারে) হিন্দুধর্মের অনুগামীগণকে হতাশ করে এবং তারা বিপুল সংখ্যায় পূর্ব ভারতের দিকে অভিবাসন করে। হিউ-এন-সাং কামরূপে বেশ কিছু শিক্ষিত ব্রাহ্মণের চলে যাওয়ার কথা উল্লেখ করেছেন। বেশ কিছু ব্রাহ্মণ কামরূপে বসবাসের জন্য ভাস্করবর্মনের কাছ থেকে ভূমি লাভ করেন। কুলজি গ্রন্থে কণৌজের বেশ কিছু ব্রাহ্মণের বাংলায় অভিবাসনের উল্লেখ রয়েছে। সরযূ (উত্তর প্রদেশ) তীরবর্তী অঞ্চল থেকে বিতারিত গ্রহবিপ্রগণকে গৌড়ে বসবাসের জন্য ভূমিদান করেছিলেন শশাঙ্ক। প্রাথমিক পর্যায়ে বাংলা ও কামরূপে সাদরে গৃহীত হলেও এই বিপুল অভিবাসন শেষ পর্যন্ত এ দুদেশের আর্থিক ও সামাজিক অবস্থার ওপর বিরূপ প্রভাব বিস্তার করেছিল।

গৌড়েশ্বর শশাঙ্কের অবমাননা এক লজ্জার ইতিহাস :-
**********************************************
গৌড়েশ্বর শশাঙ্কের নামে অনেক অভিযোগ শোনাযায়। হর্ষবর্ধনের সভাকবি বানভট্ট এবং হর্ষবর্ধন আশ্রিত চৈনিক পরিব্রাজক হিউ-এন-সাঙ দুজনেই শশাঙ্ককে বৌদ্ধবিদ্বেষী বলেছেন। বানভট্ট আরো কয়েকধাপ এগিয়ে গৌড়েশ্বরকে ‘গৌড়ভুজঙ্গ’, ‘গৌড়াধম’, ‘ছলনাকারী’ বলে কটুক্তি করেছেন। হর্ষবর্ধন নিজে এক সুত্রে লিখেছেন “গৌড়েশ্বরের নাম মুখে আনলে জিহ্বা পাপমলে লিপ্ত হয়।” এইসব অভিযোগের আদৌ কোন সত্যতা ছিল কিনা, তা আমরা একটু যুক্তিবাদী মন নিয়ে যদি নিজেদের প্রশ্ন করি তাহলেই এই উত্তর টা আমাদের নিকট কেলাসের ন্যায় স্বচ্ছ প্রতীয়মান হবে। যে ১২টা উৎস থেকে শশাঙ্ক সম্বন্ধে জানা যায় তারমধ্যে ৭,৮ ও ৯ নং উৎস থেকে দু একটা সাল-তারিখ বাদে কিছুই পাওয়া যায় না, বাকী রইল ৬ টি উৎস (১ নং থেকে ৬ নং উৎস) যেগুলি শশাঙ্কের জাতিশত্রু বা হর্ষবর্ধনের অন্ধ সমর্থক কর্তৃক রচিত বা উৎকীর্ন। তারা শশাঙ্কের নিন্দার পরিবর্তে কি গৌড়েশ্বরের গৌরবগাঁথা রচনা করবেন! তারা গৌড়েশ্বরকে তীব্র শ্লেষের বাক্যাঘাতে কালিমালিপ্ত করে হর্ষবর্ধনের গৌরব, প্রতাপ, রাজমার্গ বৃদ্ধি করবেন এটাই তো স্বাভাবিক। গৌড়াধিপতি শশাঙ্কের বিরুদ্ধে একটার পর একটা মিথ্যা অভিযোগ এনে হর্ষচরিত ও কাদম্বরীর রচয়িতা বানভট্ট ভারতের ইতিহাসকে কিভাবে বিকৃত করেছেন সেব্যাপারে আলোকপাত করা যাক। শুধু হীন প্রতিপন্ন করার জন্য শশাঙ্কের চরিত্রে কলিমালেপন করেই ক্ষান্ত হননি, স্থানেশ্বরের প্রভাকরবর্ধন, এবং তার পুত্র রাজ্যবর্ধন ও হর্ষবর্ধনকে বড় করে দেখানোর জন্য কখনও কখনও অতিরঞ্জন, ঐতিহাসিক সত্যগোপন করেছেন। আবার কখনও কখনও সত্যটাকে স্বজ্ঞানে এড়িয়ে গেছেন।
১. বানভট্ট প্রভাকরবর্ধনকে হূন-সিন্ধু-গুর্জর-লাট-মালবগনের বিজেতা বলে বর্ননা করেছেন। বাঁশখেরা অভিলেখে প্রভাকরবর্ধনের রাজ্যবিস্তারের কোন বর্ননা নেই কিন্তু তার নামে “চতুঃসমুদ্রাতিক্রান্তকীর্তিঃ প্রতাপানুরাগোপনতান্যরাজো বর্ণাশ্রমব্যবস্থাপনপ্রবৃত্তচক্র একচক্ররথ ইব প্রজানামার্তিহরঃ” বলে প্রশস্তি করা হয়েছে। কিন্তু সি-য়ু-কির বিবরন অনুযায়ী হিউ-এন-সাঙ যখন ভারতে আসেন তখন স্থানেশ্বরের পরিধি ছিল মাত্র ৭০০ লি বা ১২০০ মাইলের সামান্য বেশি। যিনি চার সমুদ্র অতিক্রম করে রাজ্য জয়ের মাধ্যমে সাম্রাজ্য গড়ে তুলেছেন তার রাজ্যের পরিধি মাত্র ১২০০ মাইল! এটা আকাশকুসুম তুল্য বিবরন নয় কি? এটা স্পষ্ঠ যে পৃষ্ঠপোষক রাজার প্রশস্তি রচনার ক্ষেত্রে বানভট্ট মিথ্যার আশ্রয় নিয়েছেন।
২. বানভট্টের বিবরনে রাজ্যবর্ধনের রাজ্যাভিষেকের কোন উল্লেখ নেই কিন্তু আর্যমঞ্জুশ্রীমূলকল্প গন্থানুযায়ী স্থানেশ্বর রাজ্যবর্ধনের রাজ্যাভিষেকের উল্লেখ আছে।
৩. বাঁশখের আভিলেখের একটা পদের বাংলা অর্থ করলে দাঁড়াই রাজ্যবর্ধন যুদ্ধে দেবগুপ্ত প্রমুখ সমস্ত রাজাকে কশাপ্রহার দ্বারা মুখ ফিরিয়ে নেওয়া দুষ্ট ঘোড়াদের মত নিয়ন্ত্রন করেছিলেন। শত্রুদের উন্মুলিত করে, পৃথিবী জয় করে এবং প্রজাদের প্রিয়কার্য সাধন করে সত্যরক্ষার্থে শত্রুগৃহে প্রান ত্যাগ করেন। কিন্তু কি সত্যরক্ষার্থে রাজ্যবর্ধন শত্রুগৃহে গেলেন এবং সত্যরক্ষার্থে তাকে শত্রু গৃহেই বা কেন যেতে হল সেব্যপারে বানভট্ট পুরোপুরিভাবে নিরব। রাজ্যবর্ধনের মৃত্যুর খবর স্থানেশ্বরে পরিবেশন করেন সংবাদক নামের এক দূত, অত্যন্ত ভগ্নহৃদয়ে। কিন্তু সংবাদক পরিবেশিত রাজ্যবর্ধনের মৃত্যু সংবাদের বিস্তারিত বর্ননা বানভট্ট দেননাই।
৫. হর্ষচরিতের টীকাকার শঙ্করের মতে শশাঙ্ক নিজ কন্যার সাথে রাজ্যবর্ধনের বিবাহ দিয়ে স্থানেশ্বরের সাথে সন্ধি স্থাপনে আগ্রহী ছিলেন। রাজ্যবর্ধন প্রস্তাবে রাজী হয়ে নিরস্ত্র অবস্থায় গৌড় যাত্রা করেন এবং শত্রুগৃহে তাকে ছল-কপটতার সাহায্যে হত্যা করা হয়। একথার সত্যতা নিয়ে সন্দেহ আছে, যে রাজাকে নিয়ে বানভট্ট পঞ্চমুখ প্রশংসা করেছেন রাজনৈতিক দুরদর্শিতার উদাহরন তুলেধরেছেন সেই রাজ্যবর্ধনকে জাতিশত্রু শশাঙ্ক যেই নিজকন্যার সাথে বিবাহের প্রস্তাব দিলেন আর ওমনি তিনি অগ্রপশ্চাৎ বিবেচনা না করে শত্রুগৃহে গেলেন তাও আবার নিরস্ত্র অবস্থায়! এটা কি বিশ্বাসযোগ্য??? আর শঙ্করের কথাই যদি সত্যি ধরে নিই তা হলে রাজ্যবর্ধনের রাজপদে বসার যোগ্যতা নিয়ে বড়সড় প্রশ্নচিহ্ন উঠে যায়। আর এইরকম লোককে যারা রাজপদে অভিষিক্ত করেন তাদের যোগ্যতা নিয়েও প্রশ্ন ওঠে।
৬. বানভট্ট স্বরচিত হর্ষচরিত হিউ-এন-সাঙ স্বরচিত সি-য়ু-কিতে শশাঙ্ককে বৌদ্ধ বিদ্বেষী বলেছেন। শশাঙ্কের নামে বোধিবৃক্ষ ছেদনের অভিযোগ রয়েছে। বানভট্টের বিবরন অনুযায়ী বোধিবৃক্ষ ছেদনের পাপে গৌড়াধিপ কুষ্ঠ রোগে আক্রান্ত হন। এইরোগে তার অঙ্গ প্রত্যঙ্গ পচনের ফলে মৃত্যুমুখে পতিত হন। হিউ-এন-সাঙ ৬৩৬-৬৩৭ খ্রীস্টব্দে গৌড় রাজ্য পরিভ্রমনে এসে শোনেন কিছুদিন আগেই বোধিবৃক্ষ ছেদনের পাপে গৌড়েশ্বরের কুষ্ঠব্যধিতে মৃত্যু হয়েছে। তিনি তার বিবরনেও এটি লিখেগেছেন। দুজনের বিবরনই সন্দেহজনক। কারন একটা গাছ ছেদনের জন্য কারুর কি কুষ্ঠ রোগ হয়? যদি তাই হতো তাহলে সোমনাথ মন্দির ধ্বংসকারি সুলতান মামুদ, নালন্দা বিশ্ববিদ্যালয় ধ্বংসকারী ইখতিয়ার উদ্দিন মহম্মদ বিন বখতিয়ার খলজি, কোনার্ক ও পুরীর জগন্নাথ মন্দির ধ্বংসকারি কালাপাহাড়ের তো কর্কট রোগ হওয়া উচিত ছিল। শশাঙ্ক যদি সত্যিই বৌদ্ধবিদ্বেষী হতেন তাহলে তাঁর রাজ্যে কি কোন বৌদ্ধবিহার গড়ে উঠতে দিতেন? কিন্তু তৎকালীন গৌড়ে রক্তমৃত্তিকা মহাবিহার ছাড়াও আরও ১০ টি সমৃদ্ধশালি বৌদ্ধবিহারের উপস্থিতির প্রমান পাওয়া গেছে। তাহলে কোন যুক্তিতে শশাঙ্ক বৌদ্ধবিদ্বেষী বনে গেলেন? বানভট্ট ও হিউ-এন-সাঙের অন্ধরাজানুগত্যের কারনে?
৭.হর্ষবর্ধন বলেছেন যে গৌড়ের শাসকের নাম মুখে আনলে জিহ্বা পাপকার্যে লিপ্ত হয়। হিউ-এন-সাঙের গৌড় ভ্রমন বৃত্তান্ত অনুযায়ী তৎকালীন গৌড় শিক্ষা-সংস্কৃতিতে সমৃদ্ধশালি জনপদ ছিল এবং গৌড়ের প্রজার অত্যন্ত সৎ, ন্যায়পরায়ন ও নিষ্ঠাবান ছিলেন। এত নিষ্ঠবান প্রজাদের পালক রাজা শশাঙ্ক কি এমন পাপকার্যে লিপ্ত হয়েছিলেন যে তার নাম মুখে আনলে জিহ্বা পাপাচারে লিপ্ত হয়? হর্ষবর্ধন হয়ত শশাঙ্কের শ্রেষ্ঠতে হিংসায় জ্বলতেন। মালবরাজ মাধবগুপ্ত এবং কামরূপরাজ ভাষ্করবর্মার সাহায্যপুষ্ট হর্যবর্ধন অনেক চেষ্টা করেও শশাঙ্কের কোনরূপ অনিষ্ট সাধনে অসমর্থ হয়েই অতৃপ্ত বাসনার চুড়ান্ত আত্মপ্রকাশ ঘটিয়েছেন।
৮. হর্ষবর্ধনের প্রবল ব্রহ্মাণ বিদ্বেষ ও বৌদ্ধ প্রীতি পরম শৈব শশাঙ্ককে ব্যাথিত করেছিল তিনি হর্ষবর্ধনের সমর্থনপুষ্ট বৌদ্ধদের পৃষ্ঠপোষকতা করার পরিবর্তে অশ্রয় ও সহায়হীন ব্রাহ্মণদের নিজরাজ্যে আশ্রয় দিয়ে ছিলেন। এর মানে এই নয় যে তিনি বৌদ্ধবিদ্বেষী ছিলেন। সম্রাট অশোক বৌদ্ধ ধর্মগ্রহন করার আগে পর্যন্ত চণ্ড্রাশোক ছিলেন কিন্তু বৌদ্ধ ধর্ম গ্রহন করতেই বনে গেলেন ধর্মাশোক। হর্ষবর্ধন বৌদ্ধ ধর্ম গ্রহন করায় বনে গেলেন পরম ধার্মিক আর পরম শৈব শশাঙ্ক বেঁচে রইলেন বৌদ্ধবিদ্বেষীর তকমা নিয়ে। শশাঙ্কের কোন সভাসদ যদি তার নামে কোন প্রশস্তি রচনা করে যেতেন তাহলে হয়ত তাঁকে কলঙ্কিত করার সাহস কারুর হতনা।

Unknown Writer

Facebook Comments



Related Articles

No comments

Write a comment
No Comments Yet! You can be first to comment this post!

Write a Comment

Your e-mail address will not be published.
Required fields are marked*